বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পূর্বাহ্ন

ডাইনোসর যুগে নদী-হ্রদে ভেসে বেড়াত ভোঁদড়সদৃশ এই প্রাণী

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

চীনে ১৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের এক বিরল ও অদ্ভুত প্রাণীর জীবাশ্মের সন্ধান মিলেছে, যা আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের খাবার গ্রহণ ও সাঁতার কাটার বিবর্তনে নতুন দুয়ার খুলেছে বলে দাবি গবেষকদের।

নতুন আবিষ্কৃত জলচর প্রাণীটি আধুনিক প্লাটিপাসের মতো সাঁতার কাটত ও ভোদরের মতো শিকার করত বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

গবেষকরা ডাইনোসর যুগের জুরাসিক পর্বের নতুন স্তন্যপায়ী প্রজাতির নামকরণ করেছেন ‘মেগাকাউডা সানগি’। এর জীবাশ্মটি চীনের ইনার মঙ্গোলিয়া অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

স্তন্যপায়ী বিবর্তনের ইতিহাসে আধা-জলচর প্রাণীর প্রাচীনতম উদাহরণ এই জীবাশ্ম। মেগাকাউডা লম্বায় প্রায় ২০ ইঞ্চি ও এর ওজন ছিল ১ থেকে ২ কেজি।

বেশিরভাগ ডাইনোসরের তুলনায় এটা ছোট হলেও জুরাসিক যুগের অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় এটা ছিল প্রায় দ্বিগুণ। কারণ সে সময়কার বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীই ছিল ছুঁচোর মতো ক্ষুদ্রাকৃতির।

ভালোভাবে সংরক্ষিত জীবাশ্মটিতে চামড়া ও পশমের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে, যা প্রাণীটির দেহের স্পষ্ট অবয়ব তুলে ধরেছে। জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মেগাকাউডার গলার পেশী ও কঙ্কালের গঠন ছিল ঠিক আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো।

এই বিশেষ শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর কারণেই মানুষসহ আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীরা গিলে খাওয়ার বদলে চিবানো খাবার অল্প অল্প করে গিলতে ও স্তন্যপায়ী বাচ্চারা মায়ের দুধ চুষে খেতে পারত।

এ সপ্তাহে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।

গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো’র জীবাশ্মবিদ ঝে-সি লুও বলেছেন, “খাবার গ্রহণের অভ্যাসের দিক থেকে অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের তুলনায় আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীরা একেবারেই অনন্য।

“বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীকে জটিল দাঁতের সাহায্যে খাবার চিবিয়ে ছোট ছোট টুকরা করতে হয়, তারপর লালার সঙ্গে মিশিয়ে তা একটু একটু করে গিলতে হয়। এ চিবানো খাবারের মণ্ডটি গলবিল বা ফ্যাটিংসের পেশীবহুল নালীর মাধ্যমে পাকস্থলীতে পৌঁছায়।

“স্তন্যপায়ী প্রাণীদের এই গিলে খাওয়ার প্রক্রিয়া অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর চেয়ে একদম আলাদা। অন্যান্য অনেক প্রাণীই আস্ত খাবার বা শিকারকে গিলে ফেলে। যেমন, কুমির বড় কোনো পাখিকে এক চুমুকে বা পাইথন বা অজগর সাপ তাদের চোয়াল দুদিকে প্রসারিত করে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীকে গিলে ফেলে।

“তবে এদের দাঁত ও চোয়াল চিবানোর উপযোগী না হওয়ায় এরা একবারে বড় টুকরা গিলতে বাধ্য হয়।”

আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো মেগাকাউডার মাথার খুলির নিচে সূক্ষ্ম হাড়ের গঠন ও গলার সংযোগকারী হাড় রয়েছে, যা গলা ও জিহ্বার পেশীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করত। আধুনিক স্তন্যপায়ীদের মতোই এটা একইসঙ্গে শ্বাস নেওয়া ও খাবার খাওয়ার কাজ করতে পারত।

ডাইনোসরদের আবির্ভাবের আগে ট্রায়াসিক যুগে বা আজ থেকে প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে প্রথম আদিম বা প্রাথমিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উৎপত্তি হয়েছিল।

ছয় কোটি ৬০ লাখ বছর আগে বিশাল এক গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীরা পৃথিবীতে কিছুটা চাপে থাকলেও এরা ধীরে ধীরে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন পরিবেশগত অংশে জায়গা করে নিতে পেরেছিল।

বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশগত বৈচিত্র্য

মেগাকাউডা ‘ডোকোডন্ট’ নামের এক স্তন্যপায়ী গোষ্ঠীর সদস্য ছিল। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে এর উৎপত্তি হয়েছিল এবং প্রায় ৯ কোটি বছর ধরে এরা পৃথিবীতে টিকে ছিল।

বর্তমানে এই গোষ্ঠীর কোনো প্রত্যক্ষ বংশধর বা উত্তরসূরি জীবিত নেই। ডোকোডন্ট গোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রজাতি মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে বাস করত, কেউ গাছে চড়ত, আবার কেউ মেগাকাউডার মতো জলে-স্থলে মানিয়ে নিয়ে আধা-জলচর হয়ে উঠেছিল।

গবেষণাপত্রের জ্যেষ্ঠ লেখক লুও বলেছেন, “ডাইনোসরদের আধিপত্য থাকা বাস্তুতন্ত্রেও স্তন্যপায়ী প্রাণীরা যে কতটা বিচিত্র ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশে টিকতে সক্ষম ছিল, মেগাকাউডার আবিষ্কার সেই প্রমাণের পাল্লাকেই ভারী করল।”

হ্রদের তলদেশের পলি থেকে গঠিত এক প্রাচীন পাথরের ভেতর প্রাণীটির জীবাশ্ম পাওয়া যায়।

গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক ও জার্মানির ‘ইউনিভার্সিটি অফ বন’-এর জীবাশ্মবিদ থমাস মার্টিন বলেছেন, “মেগাকাউডা পানিতে সাঁতার কাটার সময় সামনের ও পেছনের পাগুলোকে বৈঠার মতো ব্যবহার করত ও লেজ নাড়িয়ে দেহকে তরঙ্গের মতো বাঁকিয়ে আগে বাড়ত। এরা সম্ভবত নদী বা হ্রদের তীরে গর্ত খুঁড়ে বাস করত।”

প্রাণীটির দেহের গঠন, বিশেষ করে এর ধড় ও পেছনের পাগুলো আধুনিক প্লাটিপাসের সঙ্গে অনেকটাই মেলে। তবে প্লাটিপাসের মতো এদের চ্যাপ্টা ঠোঁট বা চঞ্চু ছিল না।

বিভার ও প্লাটিপাসের মতো এদের চ্যাপ্টা চওড়া লেজ ছিল, যা বিভারের লেজের মতোই ছোট ছোট আঁশ দিয়ে ঢাকা ছিল। এর বৈজ্ঞানিক নামের মানেও ‘বড় লেজ’।

চীন থেকেই উদ্ধার হওয়া ‘কাস্টোরোকাউডা’ নামের ছোট আকারের আরেকটি আধা-জলচর জুরাসিক ডোকোডন্টের সন্ধান মিলেছিল, যা মেগাকাউডার চেয়ে কিছুটা পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে বাস করত।

বর্তমান যুগের ভোঁদড় ও মিঙ্কের মতো জলচর শিকারি স্তন্যপায়ীদের মতোই মেগাকাউডার দাঁত ও চোয়ালের গঠন ছিল মাংসাশী খাদ্যাভ্যাসের উপযোগী।

এর বিশেষায়িত ক্যানাইন বা শিকারি দাঁতে তিনটি মূল বা শেকড় ছিল, যা আজকের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে বিরল। মাংস কাটার জন্য এদের চিবানোর দাঁতগুলোও আধুনিক মাংসাশী স্তন্যপায়ীদের চেয়ে আলাদাভাবে মাংস কাটতে ও চিবাতে পারত। আর পিচ্ছিল শিকার বা মাছ আটকে রাখার জন্য এর দাঁতের চূড়াগুলো পেছনের দিকে বাঁকানো ছিল।

মেগাকাউডার পাকস্থলীর অবশিষ্টাংশে হাড়ের ছোট ছোট টুকরা পাওয়া গেছে, যা থেকে প্রমাণ মেলে, এরা ছোট আকারের মেরুদণ্ডী প্রাণী খেত। যেসব শিলা বা পাথর থেকে এর জীবাশ্ম উদ্ধার হয়েছে সেসব জায়গায় স্যালামান্ডারের জীবাশ্মও মিলেছে।

গবেষক লুও বলেছেন, মেগাকাউডাকে সবসময় মাংসাশী থেরোপড ডাইনোসরদের আক্রমণ থেকে সতর্ক থাকতে হত। ফলে নিজেদের বাঁচাতে এরা নিশাচর হতে পারে বা ভোর ও গোধূলির আবছা আলোয় খাবারের সন্ধানে বের হত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com