বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন

চীনে বিয়ে’র ফাঁদ, লাখ লাখ ইউয়ান খোয়াচ্ছেন পুরুষেরা

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

 

চীনে বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেক পুরুষ। বিশেষ করে দেশটির কিছু এলাকায় ‘ফ্ল্যাশ ম্যারেজ’ বা দ্রুত বিয়ের নামে গড়ে ওঠা ঘটক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে এমন প্রতারণার অভিযোগ বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই বিয়ে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে জানা যাচ্ছে, পাত্রী সম্পর্কে দেওয়া অনেক তথ্যই মিথ্যা।

চীনের ৩৭ বছর বয়সী ওয়াং ঝুয়াং এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও বিয়ে করতে না পেরে তিনি একটি ঘটক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে গুইঝৌ প্রদেশের রাজধানী গুইয়াংয়ে যান। সেখানে তাকে বলা হয়েছিল, গুইঝৌর মেয়েরা সংসারী, মিতব্যয়ী ও গৃহস্থালির কাজে দক্ষ।

ওয়াং কয়েকজন নারীর সঙ্গে দেখা করার পর একজনকে পছন্দ করেন। তার ধারণা হয়েছিল, ওই নারী অবিবাহিত, কোনো সন্তান নেই এবং তার চেয়ে সামান্য কম বয়সী। কয়েক দফা সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের পর মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই তিনি তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পাওনাদারেরা ওই নারীকে খোঁজ করতে শুরু করলে ওয়াং সন্দেহ করেন। পরে ওই নারীর মুঠোফোন ও বিভিন্ন নথি ঘেঁটে জানতে পারেন, তার স্ত্রী আগে তিনবার বিয়ে করেছিলেন, তার তিন সন্তান রয়েছে এবং তিনি বড় অঙ্কের ঋণে জর্জরিত ছিলেন। এমনকি নিজের বয়স নিয়েও তিনি মিথ্যা বলেছিলেন।

ওয়াং জানান, বিয়ের জন্য তিনি শুধু কনের পরিবারকেই ৩ লাখ ইউয়ানের বেশি দিয়েছেন। বিয়ের অনুষ্ঠানসহ সব মিলিয়ে তার ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ ইউয়ান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৭০ থেকে ৯০ লাখ টাকার সমান।

স্ত্রীকে বিষয়টি জানালে তিনি বিচ্ছেদে রাজি হন। কিন্তু তাকে দেওয়া কোনো অর্থই তিনি ফেরত দিতে চাননি। ওয়াং পরে ঘটক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন, সেটি বন্ধ করে মালিকেরা চলে গেছে।

ওয়াংয়ের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চীনে পুরুষ ও নারীর সংখ্যার বড় ব্যবধানের কারণে বিয়ের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। কয়েক দশক ধরে চালু থাকা এক সন্তান নীতি এবং ছেলে সন্তানের প্রতি সামাজিক পছন্দের কারণে দেশটিতে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে।

বর্তমানে চীনে নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি বেশি। এই ব্যবধান বিশেষ করে ছোট শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিয়ের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করেছে। এসব এলাকার অনেক পুরুষের জন্য বিয়ে করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ওয়াং বলেন, তার শহরে একজন পুরুষের কাছ থেকে বিয়ের ক্ষেত্রে গাড়ি, বাড়ি ও পরিবারের ব্যবসা থাকার মতো নানা প্রত্যাশা রয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে ‘ব্রাইড প্রাইস’ বা কনের পরিবারকে দেওয়া অর্থের প্রচলন, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত বিয়ে করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ঘটক প্রতিষ্ঠানগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। চীনে ঘটক প্রতিষ্ঠান নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত বয়স্ক পুরুষদের লক্ষ্য করে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও সম্প্রতি জানিয়েছে, এই শিল্পে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অবৈধ কর্মকাণ্ড ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ঘটক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধের ঘটনায় চীনে এক হাজার ৫৪৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চলতি মাসে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় পাঁচটি সরকারি সংস্থা যৌথভাবে দেশজুড়ে ঘটক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে।

এক ঘটনায় জানা গেছে, একটি ঘটক প্রতিষ্ঠান প্রতারণার জন্য কারাওকে প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীদের ব্যবহার করে ১২৮ জনকে ফাঁদে ফেলে। এভাবে তাদের কাছ থেকে ২৫ লাখ ইউয়ানের বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়।

আইনজীবী ফান বিংহে বলেন, দ্রুত বিয়ের নামে প্রতারণা বন্ধে সরকার চাইলে এই খাতের জন্য বিশেষ আইন ও বিধিমালা তৈরি করতে পারে।

গুইয়াংয়ে এ ধরনের ঘটক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। শহরের একটি ঘটক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক বিদেশি গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের ব্যবসার মূল লক্ষ্য হলো এমন নারী ও পুরুষকে একত্র করা, যারা সত্যিই একসঙ্গে জীবন কাটাতে চান।

ওই ব্যবস্থাপক বলেন, স্থানীয় ঘটকেরা সাধারণত নারীদের সম্পর্কে তথ্য দেন এবং একই গ্রামের হওয়ায় তাদের পরিবার সম্পর্কে জানেন। গ্রাহকের দেওয়া তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে অর্থ ফেরতের সুযোগ রয়েছে।

তবে প্রতারণার শিকার পুরুষদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন।

৫৯ বছর বয়সী শু রুলিন তার ছেলের জন্য পাত্রী খুঁজতে গিয়ে একটি ঘটক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ ইউয়ান খরচ করেন। তিনি ছেলেকে নিয়ে এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে গুইয়াংয়ে যান। প্রথমবার পাত্রীকে দেখার মাত্র সাত দিনের মধ্যে তার ছেলের বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ের পর ওই নারী একটি আইফোন কিনে দিতে বলেন। পাশাপাশি ব্যবসার জন্য প্রায় ২০ হাজার ইউয়ান এবং বিয়ের পোশাক ও গয়নার জন্য আরও ১ লাখ ২০ হাজার ইউয়ান চান বলে শু জানান। পরিবারটি তার জন্য বাড়ি কিনে দেওয়ারও পরিকল্পনা করেছিল।

কিন্তু বিয়ের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ওই নারী বাড়ি ছেড়ে চলে যান। পরে পুলিশ তাকে আটক করে এবং ওই দম্পতির বিচ্ছেদ হয়। ঘটক প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও এ বছরের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে শু জানান। তবে নিজের ক্ষতির অর্থ ফেরত পেতে তিনি এখনো গুইয়াংয়ে অবস্থান করছেন।

আইনজীবী ফান বিংহে বলেন, এসব ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়াও কঠিন। কারণ চীনের আইনে এ ধরনের বিয়ের প্রতারণাকে আলাদাভাবে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে কাউকে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করতে হলে প্রমাণ করতে হয়, বিয়ের শুরু থেকেই তার উদ্দেশ্য ছিল সঙ্গীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া।

অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দাবি করেন, তারা সত্যিই বিয়ে করে সংসার করতে চেয়েছিলেন। পরে সম্পর্কের মধ্যে মতবিরোধ ও অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায় তারা আলাদা হয়ে গেছেন। ফলে প্রতারণার উদ্দেশ্য প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের প্রতারণার পর ওয়াংয়ের ভাড়া করা বাসাটি এখন অন্য ভুক্তভোগী পুরুষদের জন্য এক ধরনের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রতারণাকারী ঘটক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের খুঁজছেন, আবার কেউ অল্প দিনের মধ্যে চলে যাওয়া স্ত্রীদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

ওয়াং নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে অন্য পুরুষদের সতর্ক করছেন। তবে এত কিছুর পর তিনি আবার বিয়ে করবেন কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন।

ওয়াং বলেন, এমনিতেই তার জন্য বিয়ে করা কঠিন ছিল। এর মধ্যে এত অর্থ হারানোর পর এখন আর বিয়ের কথা ভাবছেন না। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি বিচ্ছেদ ও অর্থ ফেরতের চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে কবে ফিরতে পারবেন, সেটিও তিনি জানেন না।

তার ভাষায়, পরিস্থিতির যেন কোনো শেষ নেই।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com
Raytahost Facebook Sharing Powered By : Raytahost.com